বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ০৯:২৭
সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহ প্রজন্মের জন্য জিহাদ ও ধৈর্যের আদর্শ রেখে গেছেন, প্রতিরোধের কৌশলগত ভিত্তি ইরান

লিবীয় লেখক ও রাজনৈতিক গবেষক সালেহ আল-কামিশি বলেছেন, সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ প্রজন্মের জন্য জিহাদ, ধৈর্য, দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের এক গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। তাঁর নেতৃত্ব প্রতিরোধের চিন্তা ও কৌশলে গভীর প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে তিনি প্রতিরোধের সমর্থনে ইরানের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ইরানের সমর্থন প্রতিরোধের সক্ষমতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ভূমিকা রেখেছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর শাহাদাতের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিরোধের ময়দান ও জনগণের চেতনা থেকে তাঁর প্রভাব মুছে যায়নি। সর্বোচ্চ সংঘাতের সময় শাহাদাতবরণকারী এই নেতা তাঁর পেছনে রেখে গেছেন একটি পথ, চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা ও এমন এক উত্তরাধিকার, যা প্রতিরোধের স্মৃতি ও পরবর্তী প্রজন্মের চেতনার অংশে পরিণত হয়েছে। লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন প্রতিরোধের ময়দানেও তাঁর রেখে যাওয়া প্রভাবের কথা এখনও আলোচিত হচ্ছে।

সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহর উত্তরাধিকার নিয়ে লেবাননের সংবাদমাধ্যম আল-আহদ-এর সঙ্গে আলাপকালে সালেহ আল-কামিশি বলেন, সময় পেরিয়ে গেলেই তাঁর অনুপস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়নি। বরং সংঘাত যত বিস্তৃত হচ্ছে এবং স্থিরতা, দূরদর্শিতা ও সাহসের প্রয়োজন যত বাড়ছে, তাঁর নেতৃত্বের স্মৃতি ততই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

প্রতিরোধ কোনো এক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়
আল-কামিশির মতে, প্রতিরোধযোদ্ধাদের দৃঢ়তা, সহনশীলতা এবং যুদ্ধের কৌশল ও প্রযুক্তিতে নতুনত্বের মাধ্যমে সামরিক ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, প্রতিরোধ কোনো এক ব্যক্তির উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়—যদিও সেই নেতার মর্যাদা ও ভূমিকা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক।

পরাজয়ের মানসিকতা থেকে বিজয়ের প্রত্যাশা
সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে আল-কামিশি উল্লেখ করেন, তিনি প্রতিরোধের মাধ্যমে বিজয় অর্জনের সম্ভাবনার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেকের মনে ইসরায়েলি-আমেরিকান সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সামনে প্রতিরোধ ও বিজয়ের সম্ভাবনা নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সেই ধারণায় পরিবর্তন আনে। ওই যুদ্ধে প্রতিরোধ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি নতুন সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় এবং দেখিয়ে দেয়, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই বিজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও মানসিক দৃঢ়তা নিশ্চিত হয় না।

আল-কামিশি এমন এক সময়ের কথাও উল্লেখ করেন, যখন আরব বিশ্বের অনেক সরকারি ব্যবস্থা আত্মসমর্পণমূলক অবস্থানে চলে গিয়েছিল এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ধারণাকে অনেকেই অবাস্তব বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, সাবেক লেবানিজ প্রেসিডেন্ট এমিল লাহুদের অবস্থান ছিল এই প্রবণতার বিপরীত একটি উদাহরণ। পরবর্তীতে সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহর নেতৃত্বে প্রতিরোধ সেই অবস্থানকে বাস্তব ময়দানের সক্ষমতায় রূপ দেয়।

চিন্তা ও কর্মে নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি
আল-কামিশি বলেন, সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহর মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক দূরদর্শিতার সমন্বয় ঘটেছিল। তাঁর ভাষায়, তিনি ছিলেন বক্তব্যে সত্যনিষ্ঠ, বিশ্লেষণে গভীর, সিদ্ধান্তে বিচক্ষণ এবং সংঘাতের সময় সাহসী।

তিনি সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহকে হযরত আলী (আ.)-এর প্রজ্ঞা, সাহস ও দৃঢ়তার একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, এসব গুণ কেবল বক্তৃতা বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বিষয় ছিল না; বরং রাজনীতি, প্রতিরোধ এবং মুজাহিদ ও জনগণের সঙ্গে তাঁর আচরণে সেগুলোর প্রকাশ ঘটেছিল।

আল-কামিশির দৃষ্টিতে, নাসরুল্লাহর উত্তরাধিকার শুধু সামরিক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও মানবিক উত্তরাধিকার, যেখানে পরাজয়ের যুগে নেতৃত্বের ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—দায়িত্বের সঙ্গে আত্মত্যাগ, শক্তির সঙ্গে দূরদর্শিতা এবং বিজয়ের সঙ্গে ধৈর্য ও দৃঢ়তাকে যুক্ত করা হয়েছে।

স্বাধীনতা ও নিপীড়িত মানুষের জন্য এক অনুপ্রেরণা
আল-কামিশি বলেন, সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহ কেবল একজন লেবানিজ নেতা ছিলেন না; তিনি স্বাধীনচেতা, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের কাছে একটি অনুপ্রেরণার প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর মতে, নাসরুল্লাহ প্রজন্মের পর প্রজন্মের প্রতিরোধযোদ্ধাদের শিখিয়েছেন—স্বাধীনতার পথ কেবল আকাঙ্ক্ষায় তৈরি হয় না; এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, দৃঢ়তা, সচেতনতা এবং পরিস্থিতির যথাযথ উপলব্ধি।

তিনি আরও বলেন, নাসরুল্লাহর নেতৃত্বে প্রতিরোধকে কেবল দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটিকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করা।

ইসরায়েলি-আমেরিকান প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
আল-কামিশির মতে, বর্তমান সংঘাত কেবল দুই পক্ষের সীমিত সামরিক লড়াই নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক নানা স্বার্থ জড়িত। তাঁর ভাষায়, এই বৃহত্তর প্রকল্পের লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করা, যাতে তা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূলে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রতিরোধের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ধারাবাহিক সংঘাতগুলো দখলদার বাহিনীর দুর্বলতা এবং তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সমর্থনের নির্ভরতা প্রকাশ করেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিরোধযোদ্ধাদের দৃঢ়তা, সক্ষমতার বিকাশ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত উদ্ভাবন দেখিয়েছে যে সংঘাত আর কেবল প্রতিপক্ষের নির্ধারিত নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে না। প্রতিরোধও যুদ্ধের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের পদ্ধতি ও সক্ষমতা পরিবর্তন ও উন্নত করতে পারে।

প্রতিরোধের কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে ইরান
আল-কামিশি প্রতিরোধে ইরানের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ইরান প্রতিরোধের কাঠামোর একটি প্রধান ভিত্তি এবং এর সমর্থন শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও সামরিক—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তা বিস্তৃত।

তিনি বলেন, এই সমর্থনের কারণে প্রতিরোধ দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মতো একটি পরিবেশ পেয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে, প্রতিরোধের সংগ্রাম কেবল সামরিক সংঘাত নয়; এর সঙ্গে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সার্বভৌমত্ব এবং বিদেশি চাপমুক্তভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের প্রশ্নও জড়িত।

সানা থেকে গাজা ও দক্ষিণ লেবানন—এক অভিন্ন সংগ্রামের দাবি

সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আল-কামিশি ‘তুফান আল-আকসা’ অভিযানে নিহত ব্যক্তি এবং সানা, গাজা ও দক্ষিণ লেবাননসহ বিভিন্ন প্রতিরোধ ফ্রন্টের নিহতদের স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগ একটি অভিন্ন আদর্শের সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের রক্ত দখলদারিত্ব ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রামের একটি বৃহত্তর ধারাকে নির্দেশ করে।

একই সঙ্গে তিনি ময়দানে সক্রিয় প্রতিরোধযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং প্রতিরোধের গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, যুদ্ধের পাশাপাশি তথ্য ও বয়ানের লড়াইটিও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ময়দানে সংঘটিত ঘটনাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং প্রতিপক্ষের প্রচারিত বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করা এই লড়াইয়েরই অংশ।

শাহাদাত সমাপ্তি নয়, ধারাবাহিকতা
লিবীয় এই রাজনৈতিক গবেষকের মতে, সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহর শাহাদাত কোনো নেতার পথচলার সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পরিবর্তে প্রতিরোধের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা যেতে পারে। শাহাদাত তাঁর অভিজ্ঞতাকে শেষ করে দেয়নি; বরং তাঁকে এমন একটি প্রতীকে পরিণত করেছে, যাকে পরবর্তী প্রজন্ম প্রতিরোধের বিভিন্ন পর্যায়ে স্মরণ করবে।

আল-কামিশি বলেন, শহীদরা শুধু শূন্যতা রেখে যান না; তাঁরা আদর্শও রেখে যান। তাঁর মতে, সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকারগুলোর একটি হলো—তিনি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য জিহাদ, ধৈর্য, দৃঢ়তা ও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার একটি দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। এই উত্তরাধিকার কোনো এক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একই আদর্শ ধারণকারী প্রত্যেক ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে তা বহমান থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নাসরুল্লাহর উত্তরাধিকার বৃহত্তর প্রতিরোধের চিন্তাধারা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাঁর মতে, এই ধারায় ইসলামকে কর্ম, মর্যাদা ও মুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি জীবনদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং আত্মসমর্পণ, বিভাজন ও বিভ্রান্তিকে বৈধতা দেওয়ার ব্যাখ্যার বিপরীতে সম্মান, মর্যাদা ও নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানোর মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আল-কামিশির ভাষায়, তাই সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহকে স্মরণ করা শুধু অতীতের পুনরালোচনা নয়; বরং তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিরোধ, উম্মাহর ঐক্য, আধিপত্য প্রত্যাখ্যান, ফিলিস্তিনের প্রতি অঙ্গীকার এবং স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামের আদর্শকে বর্তমানের আলোচনায় ফিরিয়ে আনা।

সাক্ষাৎকারের শেষে আল-কামিশি সাইয়্যেদ নাসরুল্লাহ ও প্রতিরোধের সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি এবং তাঁরা যে পথ তৈরি করে গেছেন, সেই পথ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্মুক্ত থাকবে—যতদিন এমন মানুষ থাকবে যারা বিশ্বাস করে মর্যাদা কারও দান নয়, স্বাধীনতা ভিক্ষা করে অর্জন করা যায় না এবং ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য আত্মত্যাগের মূল্য রয়েছে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha